(১ম প্রতিবেদন ) কালী শব্দের অর্থ কী? কালীর স্বরূপ কী? কালী আবির্ভূতা হন কেমন করে? এবং আবির্ভূতা হওয়ার কারণই বা কী?
ওঁ কালি কালি মহাকালি কালিকে পাপহারিনি দেবী নারায়ণী নমস্তুতে ,মহিষাঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনী আয়ুরোগয় বিজয়ং দেহি দেবী নমস্তুতে ।
কালী শব্দে অর্থ কে?
‘কালী’ শব্দটি ‘কাল’ শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের অর্থ ‘কৃষ্ণ’ (কালো) বা ‘ঘোর বর্ণ’(পাণিনি ৪।১।৪২)।হিন্দু মহাকাব্য মহাভারত-এ যে ভদ্রকালীর উল্লেখ আছে, তা দেবী দুর্গারই একটি রূপ (মহাভারত ৪।১৯৫) মহাভারত-এ ‘কালরাত্রি’ বা ‘কালী’ নামে আরও এক দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। ইনি যুদ্ধে নিহত যোদ্ধৃবর্গ ও পশুদের আত্মা বহন করেন। আবার হরিবংশ গ্রন্থে কালী নামে এক দানবীর উল্লেখ পাওয়া যায় (হরিবংশ, ১১৫৫২) কাল’ শব্দের দুটি অর্থ : ‘নির্ধারিত সময়’ ও ‘মৃত্যু’। ‘কালী’ কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ হল কালী। ‘কালী’ হল কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ। কাল মানে সময়, আবার কাল ও কৃষ্ণবর্ণ দুই হয় ।
কালীর স্বরূপ কী?
তন্ত্র অনুসারে কালী দশমহাবিদ্যা প্রথম দেবী। কেরালা ব্যতীত সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশে কালীকে ভগবান শিবের স্ত্রী পার্বতীর রূপ হিসাবে বিশ্বাস করা হয়। কেরালার লোকবিশ্বাস অনুসারে— ভগবান শিবের তৃতীয় নয়ন থেকে রাক্ষসদের ধ্বংস করার জন্য তিনি আবির্ভূতা হন, তাই কেরালায় তাঁকে ভৌরবকন্যা মহাকালী বলা হয়। দেবীদুর্গা যাকে ভ্রু যুগলের মাঝ থেকে যার জন্ম দেন তিনি কালী। কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরা।
কালী আবির্ভূতা হন কেমন করে? এবং আবির্ভূতা হওয়ার কারণই বা কী?
দেবী কালীর আবির্ভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, দেবাসুরের যুদ্ধে পরাজিত দেবতাদের প্রার্থনায় আদ্যাশক্তি ভগবতি পার্বতীর দেহ কোষ থেকে দেবী কৌষিকী আবির্ভূত হন। তখন ভগবতি দেবী কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করেন বলে তাঁর নাম কালী বা কালিকা। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিনটি কাল নিয়ে মহাকাল। আর সেই মহাকালের শক্তি কালী। ব্রহ্মার আশীর্বাদে শক্তিশালী হয়ে স্বর্গ লন্ডভণ্ড করে দিচ্ছে অসুরের দল। দেবতাদের তাড়িয়ে স্বর্গরাজ্যের দখলের চেষ্টাও করছে তারা। দেবতাদের মধ্যে ত্রাহি-ত্রাহি রব। কালিকা পুরাণ থেকে জানা যায় পুরাকালে শুম্ভ এবং নিশুম্ভ নামক দুই রাক্ষস ছিল ব্রহ্মা তাদের তপস্যতে সন্তুষ্ট হয়ে রক্তবীজ হওয়ার বর দিয়ে ছিলেন। সারা ত্রিলোক জুড়ে তখন তাদের ভয়ঙ্কর অত্যাচার ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল।পৃথিবীতে চরম অত্যাচারের শুরু করেছিল ভাতৃদ্বয়।। তাদের আক্রমণে পৃথিবীর সকল মানুষ একপ্রকার চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তারা তাদের আক্রমণের পরিধি শুধু পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি তাঁরা দেবলোকেও আক্রমণ করেছিল। দেবতারাও এই দুই দৈত্যের কাছে যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন এবং দেবতাদের দেবলোক ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। ফলে দেব লোক তাদের হাতছাড়া হয়ে যায় এমন সময় দেবতারা ভগবান বিষ্ণু,মহাদেব শিব এবং প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন । তখন তাদের সম্মিলিত উপদেশ যেন সকল দেবতারা মিলে আদ্যশক্তি মহামায়ার উপাসনা করেন । তখন দেবরাজ ইন্দ্র দেব লোক ফিরে পাওয়ার জন্য আদ্যশক্তি মা মহামায়ার তপস্যা করতে থাকেন। তখন দেবী সন্তুষ্ট হয়ে তাদের কাছে আবির্ভূত হন। মা মহামায়া অবতীর্ণ হলে তিনি দেবতাদের বরাভয় প্রদান করেন এবং অসুর নিধনে তার রুদ্র রূপ ধারণ করেন। কিন্তু কিছুতেই রক্তবীজ আশীর্বাদ প্রাপ্ত অসুরের সাথে দেবী পরে উঠছিলেন না। তখন দেবীর শরীর ক্রোধাম্বিত দেবীদুর্গা তাঁর ভ্রু যুগলের মাঝ থেকে জন্ম দেন অন্য এক দেবী যা কৌশিকী নামে ভক্তদের কাছে পরিচিত দেবী কৌশিকী মা মহামায়া দেহ থেকে নিঃসৃত হলে মা মহামায়া কাল বর্ণ ধারণ করে যা দেবী কালীর আদিরূপ বলে ধরা হয়। কালীর ভয়াবহ রুদ্রমূর্তি আর নগ্নিকা রূপে নিহত হতে থাকে একের পর এক অসুর। রক্তবর্ণ লকলকে জিভ বের করে একের পর অসুর এবং তাদের রণবাহিনী, হাতি, ঘোরা সমতে অসুরের দলকে কালী গ্রাস করতে থাকেন। রক্তবীজকে অস্ত্রে বিদ্ধ করে তার শরীরের সমস্ত রক্ত পান করে নেন কালী। রক্তবীজের শরীর থেকে একফোঁটা রক্ত যাতে মাটিতে না পরে সেজন্য কালী তাকে শূন্যে তুলে নেন। রক্তবীজকে এক্কেবারে রক্তশূন্য করে দেহ ছুঁড়ে ফেলে দেন। কালীবন্দনার মূলেই রয়েছে অশুভ শক্তিকে হারিয়ে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করা। অসুরদের সঙ্গে ঘোর প্রলয়ঙ্কর লড়াই-এ নেমেছিলেন মা-কালী। চারিদিকে তমসাচ্ছন্ন, মা-এর সেই রুদ্রমূর্তিতে দিশেহারা অসুরদের দল। সব অসুর দেবীর হাতে নিহত হলেন। (ক্রমশ : পরবর্তী লেখার জন্য অপেক্ষা করুন)
ভালো লাগলে কমেন্ট করবেন।
উত্তরমুছুন